
◼️রাজু আহম্মেদ–খুলনা
খুলনার পাইকগাছা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বাজারখোলা দোল মন্দির আজ কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রায় তিন শত বছরের পুরোনো এই মন্দির এবং এর আশপাশের নিদর্শনগুলো এখন অবহেলা আর অনাদরে ভগ্নদশায়। নতুন প্রজন্ম ভুলে যেতে বসেছে এই অঞ্চলের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।
পাইকগাছার সদর থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাজারখোলায় সুখদা সুন্দরী মাধ্যমিক বিদ্যালয় চত্বরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দোল মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ এবং কালের সাক্ষী হয়ে থাকা বিশাল এক আমগাছ। একসময় যে স্থানে ধর্মীয় পূজা, যাত্রাপালা, সংস্কৃতি চর্চা ও শিক্ষার কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল, তা আজ নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে।
দোল মন্দিরটি ১৯৮৮ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে সময় মন্দির সংস্কারের জন্য চার লক্ষ টাকার সরকারি বরাদ্দ মিললেও সরকার পরিবর্তনের পর উন্নয়ন কাজ আর এগোয়নি।
মন্দিরটির পাশেই রয়েছে জমিদার ভোলানাথ ঘোষের কাছারিবাড়ি, যেখানে খাজনা আদায়ের পর অনুষ্ঠিত হতো বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কলকাতা থেকে যাত্রাদল এসে এখানে পরিবেশন করত নাটক ও পালাগান। সাপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠান ঘিরে এলাকা হয়ে উঠত উৎসবমুখর।
এই ঐতিহাসিক স্থানটিকে ঘিরে রয়েছে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, খেলার মাঠ, ধর্মীয় উপাসনালয় ও পুকুর। প্রাচীন আমগাছটির ছায়াতলে প্রতিদিন ক্লাস শেষে বসে গল্প করে শিক্ষার্থীরা, কেউ দোল খায় ঝুলন্ত ডালে, কেউ বা কুড়িয়ে নেয় জ্যৈষ্ঠের মধুময় আম। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই আমগাছ ও বারের পুকুরের সাথে জড়িয়ে রয়েছে অলৌকিক কিছু ইতিহাসও।
স্থানীয় প্রবীণ সুনিল সেন জানান, একসময় তালের পাতায় দোয়াত-কলমে লেখা শিখেছেন এখানকার টোলে। তার স্মৃতিতে এখনও ভাসে পুকুরের গজাল মাছ, এবং সেই অলৌকিক আলো-আঁধারির গল্প। জমিদার ভোলানাথ এলাকার মানুষের জন্য সাতটি পুকুর খনন করেছিলেন, যার একটি হচ্ছে এখনকার ‘বারের পুকুর’।
মন্দির কমিটির সভাপতি অশোক কুমার ঘোষ বলেন, বাজারখোলার দোল মন্দির শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। তার মতে, এটি সংস্কার এবং সংরক্ষণ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই গৌরবময় ইতিহাস থেকে বঞ্চিত হবে।
রাস্তার অপর প্রান্তে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী গদাইপুর লেখার মাঠ। সব মিলিয়ে বাজারখোলা হয়ে উঠেছিল একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু। বর্তমানে সেখানে তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তিনটি মন্দির, একটি বড় খেলার মাঠ এবং বহু ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা রয়েছে, যেগুলোর অনেকটাই বিলুপ্তির পথে।
এলাকাবাসীর দাবি, বাজারখোলা এবং এর নিদর্শনগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও যথাযথ সংরক্ষণের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যকে আগামীর জন্য ধরে রাখা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন সরকারি সহযোগিতা ও প্রশাসনিক অঙ্গীকার। স্থানীয়দের ভাষায়, এই দোল মন্দির কেবল অতীত নয়, এটি তাদের গর্ব ও অস্তিত্বের প্রতীক।
প্রতিবেদকের নাম 




















