
অনুসন্ধান ডেস্ক:
বাংলাদেশের মাঠ প্রশাসনে যৌন কেলেঙ্কারি, অনৈতিক সম্পর্ক ও অপেশাদার আচরণের অভিযোগে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জড়িয়ে পড়ার ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। একের পর এক জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও, এসব ঘটনায় কঠোর কিংবা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির খুব একটা নেই। বরং ওএসডি করেই দায়সারা করার অভিযোগ উঠেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে।
সর্বশেষ শরীয়তপুরের ডিসি মোহাম্মদ আশরাফ উদ্দিনের সঙ্গে দুই নারীর আপত্তিকর ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে ওএসডি করা হয়েছে। কিন্তু এটিই প্রথম নয়—গত এক যুগে অন্তত আটজন ডিসি নারী কেলেঙ্কারিতে জড়িয়েছেন। তাদের কারও বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগ থাকলেও, অনেকেই পরবর্তীতে পদোন্নতিও পেয়েছেন।
২০১৩ সালে নারায়ণগঞ্জের ডিসি মনোজ কান্তি বড়ালের বিরুদ্ধে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে। তাকে এক নারীর ফ্ল্যাটে অবরুদ্ধও করা হয়েছিল। কিন্তু শাস্তির বদলে তিনি পদোন্নতি পেয়ে যুগ্ম সচিব হন।
২০১৯ সালে জামালপুরের ডিসি আহমেদ কবীরের সঙ্গে নারী সহকারীর ভিডিও ফাঁস হয়। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলেও তার শাস্তি ছিল কেবল বেতন গ্রেড কমিয়ে দেওয়া।
দিনাজপুরের ডিসি মাহমুদুল আলম, নাটোরের ডিসি গোলামুর রহমান, নেত্রকোনার ডিসি মঈনউল ইসলাম, বাগেরহাটের ডিসি এ এন এম ফয়জুল হক এবং সর্বশেষ বরগুনার ডিসি হাবিবুর রহমান—এদের সবার বিরুদ্ধেই নারী সংশ্লিষ্ট কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে। ভিডিও ফাঁস, বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে শারীরিক সম্পর্ক কিংবা অশোভন বার্তা—নানা অভিযোগে অভিযুক্ত হলেও তাদের অধিকাংশই শাস্তি এড়িয়ে গেছেন। কেউ কেউ পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়েছেন, হয়েছেন যুগ্ম সচিবও।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রশাসনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতির বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় না। সাবেক সচিবরা মনে করেন, অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যদি স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুতিসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তবে অনাচার কমে যেত।
সচিবালয় সূত্র বলছে, অধিকাংশ কেলেঙ্কারির তদন্ত হয় দেরিতে, কিছু হয় না বললেই চলে। আবার তদন্ত হলেও তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কিংবা শাস্তি গোপন থাকে। ওএসডি করা হয় মাত্রই প্রশাসনিক ব্যবস্থা, সেটি শাস্তি নয়—এটা জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট বক্তব্য।
ভুক্তভোগী নারীদের অভিযোগও থেকে যায় উপেক্ষিত। যেমন হাবিবুর রহমানের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগে ভুক্তভোগী নারী ৫ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ চেয়ে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু কোনো জবাব মেলেনি।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশাসনের নৈতিক অবক্ষয় ও শৃঙ্খলা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের দাবি, কেবল ওএসডি নয়, অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা এবং তা জনসমক্ষে প্রকাশ করলেই কেলেঙ্কারি কমানো সম্ভব।
এখন প্রশ্ন—প্রশাসনের এই অপরাধ-অনাচার রোধে সরকার আদৌ কতটা আন্তরিক?
ঢাকা থেকে প্রকাশিত ৮ পাতার দৈনিক পত্রিকা
ই-পেপার