
অনুসন্ধান ডেস্ক◾
বাংলাদেশ রেলওয়ের মালিকানাধীন বিপুল পরিমাণ জমি বছরের পর বছর ধরে দখল করে রেখেছে নানা ব্যক্তি ও গোষ্ঠী। বারবার উচ্ছেদ অভিযানের ঘোষণা আসলেও বাস্তবে এসব অভিযান কার্যকর হচ্ছে না। মাঠপর্যায়ে অভিযান শুরুর আগেই গোপন সমঝোতা, লেনদেন আর রাজনৈতিক চাপের কারণে থেমে যাচ্ছে জমি উদ্ধারের কার্যক্রম।
সম্প্রতি নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, গেন্ডারিয়াসহ কয়েকটি এলাকায় অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দেওয়া হলেও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল হয়। অভিযোগ রয়েছে, নোটিশ পাঠানোর পরই কিছু দখলদার রেলওয়ের ভূসম্পত্তি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আর্থিক সমঝোতায় পৌঁছে যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ নোটিশ হাতে পেয়েই উচ্চ আদালতে রিট করে বছরের পর বছর রেলের জমি দখলে রাখছেন।
রেলওয়ের একাধিক সূত্র জানায়, মে মাসে শুধু নরসিংদীতে একটি অভিযান চালানো হলেও তা ব্যতিক্রম। গেন্ডারিয়ায় ১৯ মে উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়ার পরপরই দখলদাররা রেল কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং অভিযানের আর অগ্রগতি হয়নি। ময়মনসিংহেও অভিযান নামে মাত্র পরিচালিত হয়।
এ বিষয়ে রেলওয়ের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিন মাহমুদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “উচ্ছেদ অভিযানে যাদের স্বার্থহানি হয়, তারাই আমার বিরুদ্ধে গুজব ছড়াচ্ছে। অবৈধ দখলদারদের সঙ্গে কোনো আঁতাত বা আদালতে যাওয়ার সুযোগ নেই।”
তবে অভ্যন্তরীণ অনেক তথ্য ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। রেলওয়ের অবকাঠামো দপ্তরের সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, “রেলের প্রকৃত জমির পরিমাণ ও বেদখলের সঠিক হিসাব এখনো পরিষ্কার নয়। জনবল সংকট ও তথ্য ঘাটতির পাশাপাশি রেলের ভেতরে-বাইরে একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে উঠেছে, যারা জমি উদ্ধারে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
নথিপত্র বিশ্লেষণ বলছে, রেলের অধীনে রয়েছে ৬১ হাজার ৮২০.৯৭ একর জমি। এর মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলে ৩৭ হাজার ৪১৯.৩৫ একর এবং পূর্বাঞ্চলে ২৪ হাজার ৪০১.৬২ একর। প্রায় অর্ধেক জমিই রেলের নিজস্ব ব্যবহারে থাকলেও ১৪ হাজার ৪৭৩ একর জমি ইজারায় দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট জমির কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। বহু এলাকায় গড়ে উঠেছে মার্কেট, ভবন, গ্যারেজ, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, “যাত্রী পরিবহনের চেয়ে রেলের জমি ব্যবহার করে আয় দ্বিগুণ করা সম্ভব। অতীতের তুলনায় এবার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান জানান, “বেদখল জমি উদ্ধারে উদ্যোগ নেওয়া হলেও জনবল সংকটে কার্যক্রম পিছিয়ে যাচ্ছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার বিষয়টিতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। আশা করছি, এবার সাফল্য আসবে।”
রেলের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, “উদ্ধার কার্যক্রমে নানা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও জমি উদ্ধারে কোনো বিকল্প নেই। উদ্ধারকৃত জমি পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যবহারের মাধ্যমে রেলের আয় বাড়াতে হবে।”
পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি এবং অদৃশ্য সমঝোতার জাল ছিন্ন না হলে রেলের জমি উদ্ধার দুঃস্বপ্নই রয়ে যাবে। সুশাসন ও স্বচ্ছতা ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত ৮ পাতার দৈনিক পত্রিকা
ই-পেপার