
◼️এহিয়া আহমদ–মৌলভীবাজার
সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতায় বাস্তবায়িত “চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন” প্রকল্পের বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কমলগঞ্জ উপজেলার ২২টি চা বাগানে এই প্রকল্পের আওতায় সাত হাজার শ্রমিকের মধ্যে জনপ্রতি ছয় হাজার টাকা করে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (বিকাশ) এর মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। তবে প্রকৃত শ্রমিকদের অনেকে এই অর্থ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, আবার একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে টাকা চলে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাগান পঞ্চায়েত নেতারা শ্রমিকদের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করে সমাজসেবা অফিসে তালিকা জমা দেন। কিন্তু এই তালিকায় স্বজনপ্রীতির চিত্র স্পষ্ট। কোনো কোনো পরিবারের তিন থেকে চারজন সদস্যের নামে অর্থ এসেছে, অন্যদিকে অনেক প্রকৃত শ্রমিকের নাম থাকা সত্ত্বেও তারা কোনো টাকা পাননি।
শ্রমিকদের অভিযোগ, ভোটার আইডির তথ্য ব্যবহার করে অন্যের বিকাশ নম্বরে টাকা তোলা হয়েছে। এমনকি কারো মোবাইলে টাকা আসলেও সেটি জোরপূর্বক তুলে অন্যরা নিয়ে গেছে। শমশেরনগর চা বাগানের এক নারী শ্রমিক সবিতা রেলী পঞ্চায়েত কমিটির সম্পাদক শ্রীকান্ত কানুর বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে কমলগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
শ্রমিক গোপাল গোয়ালা, রিশু বাগতি, নিলু রাজভর, জগদিশ বাউরী ও বাবুল রেলীর ভাষ্যমতে, বাগানের কিছু নেতা পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে সাধারণ শ্রমিকদের টাকা নিজেরা আত্মসাৎ করছেন। তারা এই বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
বড়লাইনের শ্রমিক রামাকান্ত যাদব জানান, “তালিকায় আমার নাম ও আইডি থাকলেও টাকা পাইনি। আমার বিকাশ নম্বর ব্যবহার হয়নি।” একই অভিজ্ঞতার কথা জানান পারতালি তেলেঙ্গা, দুলাল শীল ও প্রিতী পাল।
আরেক শ্রমিক শিমুল লোহার বলেন, “অন্যের টাকার মেসেজ আমার মোবাইলে আসায় পাশের বাড়ির জয়প্রকাশ রাজভর ফোন নিয়ে গিয়ে টাকা তুলে আমাকে ২ হাজার দিয়ে বাকি নিয়ে গেছে।” একইভাবে ছবি লোহার জানান, তার নামে টাকা গেলেও তা পায়নি, পরে অনেক তদবিরে কিছুটা পেয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপকারভোগীর তালিকায় পঞ্চায়েত নেতৃবৃন্দ নিজেরা ও পরিবারের সদস্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। নির্মল দাস পাইনকার পরিবারের অন্তত আটজন, শ্রীকান্ত কানুর পরিবারের একাধিক সদস্য, এমনকি ভাই, বোন, ভাইয়ের স্ত্রী পর্যন্ত তালিকায় রয়েছেন।
এ বিষয়ে শ্রীকান্ত কানু গোপাল জানান, “যে যার তালিকা দিয়েছে, সেই অনুযায়ী টাকা এসেছে। আমার ছেলের বিকাশ নম্বর দিয়েই টাকা এসেছে— কেউ দিয়ে থাকলে সেটা তার ব্যাপার।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের মনু-ধলই ভ্যালী কমিটির সম্পাদক নির্মল দাস বলেন, “আমার চিকিৎসার জন্য নেতৃবৃন্দ আমার পরিবারের তালিকা দিয়েছেন। এতে দুঃখ প্রকাশ করছি।
কমলগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা অফিসার ইউসুফ মিয়া জানান, অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাখন চন্দ্র সূত্রধর বলেন, “এ ধরনের অনিয়মের অভিযোগ সত্য। আমি আগেই সতর্ক করেছিলাম। সমাজসেবা অফিসারকে জানিয়েছি। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের বরাদ্দ যদি কিছু ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বার্থে লোপাট হয়, তবে তা শুধু দুর্নীতিই নয়, শ্রমজীবী মানুষের প্রতি নির্মম অবিচার। এই ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় এনে প্রকৃত উপকারভোগীদের অধিকার নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে সর্বমহলে।
প্রতিবেদকের নাম 















