Dhaka ০২:৪৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
জুলাই অভ্যুত্থানে আহত আফজল হুসাইনের মানবসেবার স্বীকৃতি ও সরকারি চাকরির দাবি কালিয়াকৈরে উচ্ছেদ অভিযানের দুই বছর না পেরুতেই ফের বনভূমি দখল, উল্টো সাংবাদিকদের হুমকি বিএমএসএফ কক্সবাজার জেলা কমিটি গঠন: সভাপতি জসিম উদ্দিন, সম্পাদক নাজিম উদ্দীন নরসিংদীর পলাশে সরকারি সেবার মানোন্নয়নে জেলা প্রশাসকের বিশেষ দিকনির্দেশনা ঠাকুরগাঁওকে মাদকমুক্ত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান এলজিআরডি মন্ত্রীর উত্তরা পশ্চিম থানার অভিযান, ১১ আইফোন ও স্বর্ণালংকারসহ গ্রেফতার ৬ সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে সেলিম হত্যা মামলার প্রধান আসামিসহ ৮ জন পঞ্চগড় থেকে গ্রেফতার চিকিৎসাকেন্দ্রে ‘স্যার’ না বলে ‘ভাই’ ডাকায় চিকিৎসাসেবা না দেওয়ার অভিযোগ ঠাকুরগাঁওয়ে ৪ লাখ টাকার অবৈধ সার জব্দ, চালক ও হেলপারকে জরিমানা দায়িত্বশীলদের দক্ষতা বাড়াতে ঠাকুরগাঁওয়ে ছাত্রশিবিরের কর্মশালা অনুষ্ঠিত

আয়নাঘরের ভয়াবহতা: রাষ্ট্রের ছায়ায় নির্মম নির্যাতনের বিভীষিকা

  • প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেটের সময়: ১১:৫৩:৪৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৮ অগাস্ট ২০২৫
  • ১৯৭ সময় দেখুন
print news

◼️মাহবুব আলম–কাফরুল

 

বাংলাদেশে ‘আয়নাঘর’ নামটি শুনলেই গা শিউরে ওঠে। রাষ্ট্রের ছায়ায় পরিচালিত এসব গোপন নির্যাতন কক্ষ একেকটি যেন আধুনিক যুগের নির্যাতনশালা। এখানে মানবাধিকার, নৈতিকতা কিংবা ন্যায়ের কোনো স্থান ছিল না। কথা বলেছে এমন অনেক বন্দীর সঙ্গে, যাঁরা নিজেদের শরীর ও মনে বয়ে বেড়াচ্ছেন আয়নাঘরের অমানবিক অত্যাচারের ক্ষত।

নির্যাতনের পদ্ধতিগুলো ছিল পরিকল্পিত, পেশাদার এবং নির্মম। বন্দীদের বিশেষভাবে তৈরি চেয়ার বা কাঠের হাতলওয়ালা চেয়ারে বসিয়ে মাথা, হাত-পা বেল্ট দিয়ে আটকে দিয়ে দেওয়া হতো উচ্চ ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক শক। অনেক সময় এই চেয়ারটি থাকতো লোহার তৈরি, যেখানে পুরো শরীর শক দিয়ে কাঁপিয়ে দেওয়া হতো। অধিকাংশ বন্দীই এমন চেয়ারে বসে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন।

নির্যাতন এখানেই থেমে থাকতো না। প্লাস্টিকের চেয়ারের নিচে ছিদ্র করে বন্দীর অন্ডকোষে সূক্ষ্ম সূতা পেঁচিয়ে সেই ছিদ্র দিয়ে নিচে টান দেওয়া হতো। এটা ছিল কল্পনাতীত যন্ত্রণার এক নির্মম খেলা।

অনেককে ৮-৯ ফুট উচ্চতায় ঝুলিয়ে মারধর করা হতো। জানালার হুক বা দেয়ালের লোহার রডে হাত হ্যান্ডকাফ দিয়ে বেঁধে এমনভাবে ঝুলিয়ে রাখা হতো, যাতে পা মেঝেতে ছুঁয়ে গেলেও পুরোপুরি দাঁড়ানো যেত না। পায়ের নিচে পেরেকযুক্ত কাঠ রেখে দেওয়া হতো—যার ফলে ভার সইতে না পেরে অনেকের পা পেরেকে বিধে যেত।

নখ উপড়ানো ছিল আরেক ভয়াবহ নির্যাতনের ধরন। প্লায়ার্স দিয়ে হাত ও পায়ের নখ টেনে তোলা হতো। কখনো কখনো সূচালো ধাতব বস্তু ঢুকিয়ে দেওয়া হতো নখের ভেতরে। বন্দীদের হাত-পা এমনভাবে বাঁধা হতো, যাতে শরীরের ওপর অমানবিক চাপ তৈরি হয় এবং তা সহ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

কেউ কেউ ২৪ ঘণ্টা হ্যান্ডকাফে আবদ্ধ থাকতেন, যার ফলে হাতের চামড়া কেটে রক্তাক্ত হয়ে হ্যান্ডকাফের ভেতরে ঢুকে যেত। ঘুমানোর সময় পেছনমোড়া হাত বেঁধে বুকের ওপর ভর দিয়ে ঘুমাতে বাধ্য করা হতো। অনেককেই শুয়ে ঘুমাতে দেওয়া হতো না, পুরো রাত দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকতে হতো।

স্পর্শকাতর অঙ্গ লক্ষ্য করে লাঠির আঘাত, হুট করে দুই কানে প্রচণ্ড চড়, শরীরের ওপর দিয়ে বাঁশ গড়িয়ে নেওয়া, প্রস্রাব আটকে রাখার মতো নির্মম কৌশল ব্যবহৃত হতো।

অন্ডকোষে চাপ প্রয়োগ, লজ্জাস্থানে প্লাস্টিকের বস্তু ঢুকিয়ে তা চেপে ধ্বংস করা, এমনকি বন্দীদের ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধও সংঘটিত হয়েছে এই আয়নাঘরে। চোখ বাঁধা অবস্থায় অনেকের মুখে গোপনাঙ্গ প্রবেশ করানো হয়েছে বলে জানান ভুক্তভোগীরা।

নারী ও পুরুষ উভয় বন্দীই এই লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। পুরুষ বন্দীদের সামনে তাদের স্ত্রী বা কন্যাকে উলঙ্গ করে একাধিক র‍্যাব সদস্য ঝাঁপিয়ে পড়তো—এ দৃশ্য শুধু শরীর নয়, মানসিকভাবেও তাদের চিরতরে ভেঙে দেয়।

এমন ভয়ঙ্কর নির্যাতনের বর্ণনা পাওয়া গেছে বহুজনের কাছ থেকে, যাদের সঙ্গে সরাসরি কথা হয়েছে। এসব ঘটনা আর গুজব নয়, সত্যি। সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে আমাদের সময় এসেছে।

তথ্যসূত্র: প্রত্যক্ষ নির্যাতিতদের মুখ থেকে সংগ্রহিত

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয়

জুলাই অভ্যুত্থানে আহত আফজল হুসাইনের মানবসেবার স্বীকৃতি ও সরকারি চাকরির দাবি

আয়নাঘরের ভয়াবহতা: রাষ্ট্রের ছায়ায় নির্মম নির্যাতনের বিভীষিকা

আপডেটের সময়: ১১:৫৩:৪৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৮ অগাস্ট ২০২৫
print news

◼️মাহবুব আলম–কাফরুল

 

বাংলাদেশে ‘আয়নাঘর’ নামটি শুনলেই গা শিউরে ওঠে। রাষ্ট্রের ছায়ায় পরিচালিত এসব গোপন নির্যাতন কক্ষ একেকটি যেন আধুনিক যুগের নির্যাতনশালা। এখানে মানবাধিকার, নৈতিকতা কিংবা ন্যায়ের কোনো স্থান ছিল না। কথা বলেছে এমন অনেক বন্দীর সঙ্গে, যাঁরা নিজেদের শরীর ও মনে বয়ে বেড়াচ্ছেন আয়নাঘরের অমানবিক অত্যাচারের ক্ষত।

নির্যাতনের পদ্ধতিগুলো ছিল পরিকল্পিত, পেশাদার এবং নির্মম। বন্দীদের বিশেষভাবে তৈরি চেয়ার বা কাঠের হাতলওয়ালা চেয়ারে বসিয়ে মাথা, হাত-পা বেল্ট দিয়ে আটকে দিয়ে দেওয়া হতো উচ্চ ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক শক। অনেক সময় এই চেয়ারটি থাকতো লোহার তৈরি, যেখানে পুরো শরীর শক দিয়ে কাঁপিয়ে দেওয়া হতো। অধিকাংশ বন্দীই এমন চেয়ারে বসে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন।

নির্যাতন এখানেই থেমে থাকতো না। প্লাস্টিকের চেয়ারের নিচে ছিদ্র করে বন্দীর অন্ডকোষে সূক্ষ্ম সূতা পেঁচিয়ে সেই ছিদ্র দিয়ে নিচে টান দেওয়া হতো। এটা ছিল কল্পনাতীত যন্ত্রণার এক নির্মম খেলা।

অনেককে ৮-৯ ফুট উচ্চতায় ঝুলিয়ে মারধর করা হতো। জানালার হুক বা দেয়ালের লোহার রডে হাত হ্যান্ডকাফ দিয়ে বেঁধে এমনভাবে ঝুলিয়ে রাখা হতো, যাতে পা মেঝেতে ছুঁয়ে গেলেও পুরোপুরি দাঁড়ানো যেত না। পায়ের নিচে পেরেকযুক্ত কাঠ রেখে দেওয়া হতো—যার ফলে ভার সইতে না পেরে অনেকের পা পেরেকে বিধে যেত।

নখ উপড়ানো ছিল আরেক ভয়াবহ নির্যাতনের ধরন। প্লায়ার্স দিয়ে হাত ও পায়ের নখ টেনে তোলা হতো। কখনো কখনো সূচালো ধাতব বস্তু ঢুকিয়ে দেওয়া হতো নখের ভেতরে। বন্দীদের হাত-পা এমনভাবে বাঁধা হতো, যাতে শরীরের ওপর অমানবিক চাপ তৈরি হয় এবং তা সহ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

কেউ কেউ ২৪ ঘণ্টা হ্যান্ডকাফে আবদ্ধ থাকতেন, যার ফলে হাতের চামড়া কেটে রক্তাক্ত হয়ে হ্যান্ডকাফের ভেতরে ঢুকে যেত। ঘুমানোর সময় পেছনমোড়া হাত বেঁধে বুকের ওপর ভর দিয়ে ঘুমাতে বাধ্য করা হতো। অনেককেই শুয়ে ঘুমাতে দেওয়া হতো না, পুরো রাত দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকতে হতো।

স্পর্শকাতর অঙ্গ লক্ষ্য করে লাঠির আঘাত, হুট করে দুই কানে প্রচণ্ড চড়, শরীরের ওপর দিয়ে বাঁশ গড়িয়ে নেওয়া, প্রস্রাব আটকে রাখার মতো নির্মম কৌশল ব্যবহৃত হতো।

অন্ডকোষে চাপ প্রয়োগ, লজ্জাস্থানে প্লাস্টিকের বস্তু ঢুকিয়ে তা চেপে ধ্বংস করা, এমনকি বন্দীদের ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধও সংঘটিত হয়েছে এই আয়নাঘরে। চোখ বাঁধা অবস্থায় অনেকের মুখে গোপনাঙ্গ প্রবেশ করানো হয়েছে বলে জানান ভুক্তভোগীরা।

নারী ও পুরুষ উভয় বন্দীই এই লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। পুরুষ বন্দীদের সামনে তাদের স্ত্রী বা কন্যাকে উলঙ্গ করে একাধিক র‍্যাব সদস্য ঝাঁপিয়ে পড়তো—এ দৃশ্য শুধু শরীর নয়, মানসিকভাবেও তাদের চিরতরে ভেঙে দেয়।

এমন ভয়ঙ্কর নির্যাতনের বর্ণনা পাওয়া গেছে বহুজনের কাছ থেকে, যাদের সঙ্গে সরাসরি কথা হয়েছে। এসব ঘটনা আর গুজব নয়, সত্যি। সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে আমাদের সময় এসেছে।

তথ্যসূত্র: প্রত্যক্ষ নির্যাতিতদের মুখ থেকে সংগ্রহিত