
হাওরাঞ্চলসহ দেশের দূরুত্বপূর্ণ ও প্রান্তিক জনপদের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষাসেবাকে আরও গতিশীল করতে এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের শক্ত ভিত গড়ার পাশাপাশি তাদের নৈতিক ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এই নতুন রূপরেখা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সোমবার সুনামগঞ্জ জেলা পিটিআই ভবনে জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এসব কথা বলেন।
মতবিনিময় সভায় বক্তৃতাকালে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ দেশের হাওর ও দুর্গম এলাকার প্রাথমিক শিক্ষা খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ—শিক্ষক সংকটের বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সুনামগঞ্জ জেলার মতো হাওরবেষ্টিত ক্যাচমেন্ট বা অববাহিকা এলাকায় স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত আবেদন পাওয়া যায় না। অনেক সময় অন্য অঞ্চল থেকে শিক্ষক এনে তা পুষিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হলেও সেখানেও নানা জটিলতা তৈরি হয়।
প্রতিমন্ত্রী জানান, ভৌগোলিক দূরুত্ব ও যোগাযোগের প্রতিকূলতার কারণে যেসব এলাকায় শিক্ষক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে, সেই সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধানের জন্য মন্ত্রণালয় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। তবে এই কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন। সরকার হাওরের প্রতিটি শিশুর দোরগোড়ায় মানসম্মত শিক্ষা পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর।
স্কুল ফিডিং বা মিড ডে মিল কর্মসূচি প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, পুষ্টিকর ও মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে।
খাদ্য সরবরাহের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান:
প্রতিটি খাদ্য চালান প্রত্যয়িত ফুড টেকনিশিয়ান দ্বারা বাধ্যতামূলকভাবে যাচাই করা হবে।
আকস্মিক কারখানা পরিদর্শনের ব্যবস্থা থাকবে।
স্থানীয় মাদার্স কমিটির মাধ্যমে খাবারের মান যাচাই করে তা গ্রহণ করা হবে।
প্রয়োজনে ল্যাবরেটরিতে খাদ্য নমুনার মান পরীক্ষা করা হবে।
প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, খাবার সরবরাহে বা মান নিয়ন্ত্রণে কোনো ধরনের অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার, তদারকি কর্মকর্তা কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির ছাড় পাওয়ার সুযোগ নেই। তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেসব এলাকায় এই নিয়ম কঠোরভাবে মানা হচ্ছে, সেখানে ইতিমধ্যে ত্রুটি প্রায় শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে বিদ্যালয় পরিচালনার সঙ্গে স্থানীয় জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করার ওপর বিশেষ জোর দেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, শিক্ষা কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে দুটি নতুন উদ্যোগ চালু করা হচ্ছে:
১. প্যারেন্ট সার্কেল: প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করে ‘প্যারেন্ট সার্কেল’ গঠন করা হবে।
২. স্কুল বন্ধু রেজিস্টার: প্রতিটি বিদ্যালয়ে এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, সৎ ও দক্ষ সরকারি কর্মকর্তা এবং স্থানীয় ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে একটি ‘স্কুল বন্ধু রেজিস্টার’ তৈরি করা হবে।
এর মাধ্যমে বিদ্যালয়ের তদারকি জোরদার হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি এলাকাবাসীর মালিকানাবোধ আরও সুদৃঢ় হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সুনামগঞ্জ পিটিআই ভবনে আয়োজিত এই মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সুনামগঞ্জ-4 আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল, সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন এবং জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহন লাল দাস প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে বক্তারা সুনামগঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারের এই সময়োপযোগী উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং মাঠপর্যায়ে তা সফল করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
এরশাদুল হক (সুনামগঞ্জ) 




















